
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে সড়কের পাশে পেতে রাখা দুটি বোমার বিস্ফোরণে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। এ ঘটনায় আরও কয়েকজন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে স্থানীয় পুলিশ। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
শনিবার বান্নু জেলায় এ ঘটনা ঘটে। জেলাটি আফগানিস্তান সীমান্তসংলগ্ন অস্থির উত্তর ওয়াজিরিস্তান অঞ্চলের কাছাকাছি অবস্থিত।
জেলা পুলিশের প্রধান ইয়াসির আফ্রিদি সাংবাদিকদের জানান, সড়কের পাশে পেতে রাখা প্রথম বোমাটি একটি যাত্রীবাহী ভ্যানকে লক্ষ্য করে বিস্ফোরিত হয়। এতে ঘটনাস্থলেই পাঁচজন নিহত হন এবং অন্তত তিনজন আহত হন।প্রথম বিস্ফোরণের পর স্থানীয় বাসিন্দারা নিহত ও আহতদের অ্যাম্বুলেন্সে তোলার কাজ করছিলেন। এ সময় দ্বিতীয় বিস্ফোরণটি ঘটে। এতে আরও অন্তত দুজন নিহত হন।
আহতদের স্থানীয় হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বিস্ফোরণের ঘটনায় তদন্ত শুরু করেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তবে হামলার দায় তাৎক্ষণিকভাবে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী স্বীকার করেনি।আফগানিস্তান সরকার দাবি করেছে, পাকিস্তানের সীমান্তবর্তী অঞ্চলে আইএসআইএস সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে তারা একাধিক হামলা চালিয়েছে। খবর আনাদোলু এজেন্সির।
শুক্রবার আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানায়, পাকিস্তানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান এবং উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় খাইবার পাখতুনখোয়া প্রদেশে কথিত আইএসআইএসের আস্তানাগুলো লক্ষ্য করে এসব হামলা পরিচালিত হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের দাবি, ওই স্থানগুলো শত্রুভাবাপন্ন গোয়েন্দা চক্রের সহায়তায় আফগানিস্তানের বিরুদ্ধে হামলার পরিকল্পনা ও সমন্বয়ের কাজে ব্যবহৃত হতো। এছাড়া অতীতে সংঘটিত বেশ কয়েকটি প্রাণঘাতী হামলার ক্ষেত্রেও এসব ঘাঁটি অপারেশনাল কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল বলে অভিযোগ করা হয়েছে।তবে আফগানিস্তানের এই দাবির বিষয়ে পাকিস্তান সরকার বা দেশটির সামরিক বাহিনীর পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে সীমান্ত নিরাপত্তা, জঙ্গি তৎপরতা এবং একে অপরের ভূখণ্ড ব্যবহার করে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলা চালানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করে কাবুল ও ইসলামাবাদের মধ্যে সম্পর্ক উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।
আফগান প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় বলেছে, আফগানিস্তান তার নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিরুদ্ধে কোনো ধরনের হুমকি আর সহ্য করবে না।বিশ্বজুড়ে যুদ্ধ ও সংঘাতের নতুন বাস্তবতায় পারমাণবিক স্থাপনাগুলোও ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে। ইউক্রেনের জাপোরিঝঝিয়া পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে শুরু করে ইরানের নাতাঞ্জ, ফোরদো ও ইসফাহানের মতো স্থাপনাগুলো সামরিক হামলার শিকার হয়েছে।
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি এ ধরনের হামলাকে নিষিদ্ধ বিষয় হিসেবে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা শুধু একটি দেশের জন্য নয়, পুরো অঞ্চলের জন্য ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। এই প্রেক্ষাপটে ভারত ও পাকিস্তানের উদাহরণ বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
ভারত ও পাকিস্তান একাধিক যুদ্ধ করেছে এবং দুই দেশের মাঝে সম্পর্ক এখনো বৈরিতাপূর্ণ। তবুও তারা কখনো একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনা লক্ষ্য করে হামলা চালায়নি।এর পেছনে রয়েছে ১৯৮৮ সালে স্বাক্ষরিত পারমাণবিক স্থাপনা ও স্থাপনাগুলোতে হামলা নিষিদ্ধকরণ চুক্তি। চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়েছিল তৎকালীন ভারতীয় প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর আমলে।চুক্তিটি ১৯৯১ সালে কার্যকর হয়। এর মূল শর্ত হলো, দুই দেশ একে অপরের পারমাণবিক স্থাপনা ধ্বংস বা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে কোনো হামলা চালাবে না এবং এমন কোনো কর্মকাণ্ডকে সমর্থনও করবে না।
চুক্তির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো পারমাণবিক স্থাপনার তালিকা বিনিময়। ১৯৯২ সাল থেকে প্রতি বছরের ১ জানুয়ারি ভারত ও পাকিস্তান একে অপরকে তাদের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর তালিকা সরবরাহ করে আসছে। ২০২৬ সালে দুই দেশ টানা ৩৫তম বারের মতো এই তথ্য বিনিময় করেছে।
এই তালিকায় রয়েছে, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, গবেষণা কেন্দ্র, জ্বালানি উৎপাদন ইউনিট ও অন্যান্য পারমাণবিক অবকাঠামো। ফলে কোনো সংঘাতের সময়ও এসব স্থাপনা চিহ্নিত থাকে এবং হামলার ঝুঁকি কমে।
সাম্প্রতিক ২০২৫ সালের অপারেশন সিঁদুরের সময় ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে চার দিনের সামরিক সংঘর্ষ হয়েছিল। তবে সেই সময়ও উভয় দেশ পারমাণবিক স্থাপনাগুলোকে লক্ষ্যবস্তু বানায়নি।
সাবেক ভারতীয় কূটনীতিক সৈয়দ আকবরউদ্দিন বলেন, এই ব্যবস্থা একটি চুক্তির পাশাপাশি এমন একটি স্থায়ী আস্থার কাঠামো; যা পারমাণবিক উত্তেজনাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করেছে।
তিনি বলেন, সামরিক ঘাঁটি ধ্বংস হলে ক্ষতি সাধারণত নির্দিষ্ট এলাকায় সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা হলে তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়তে পারে বহু দূর পর্যন্ত। বাতাস ও সমুদ্রপথে ছড়িয়ে পড়া বিকিরণ সীমান্ত মানে না। তাই পারমাণবিক স্থাপনায় হামলাকে আন্তর্জাতিক আইন ও নিরাপত্তা নীতিতে অত্যন্ত সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে দেখা হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, ভারত-পাকিস্তান চুক্তি সব সমস্যা সমাধান করেনি। দুই দেশের মধ্যে এখনো রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা রয়েছে। তবুও এই চুক্তি দেখিয়েছে, কঠিন বৈরিতার মধ্যেও নির্দিষ্ট বিষয়ে দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতা সম্ভব।
বর্তমানে যখন বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ক্রমশ সংঘাতের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে, তখন দক্ষিণ এশিয়ার এই ব্যবস্থা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একটি কার্যকর আস্থাবর্ধক মডেল হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। সাড়ে তিন দশকেরও বেশি সময় ধরে কোনো লঙ্ঘন ছাড়াই চুক্তিটি কার্যকর থাকা প্রমাণ করে যে, প্রতিদ্বন্দ্বী রাষ্ট্রগুলোর মধ্যেও কিছু মৌলিক নিরাপত্তা নীতি টিকিয়ে রাখা সম্ভব।